মরতে বসেছে নদী।
কচুরিপানায় বন্ধ নৌ চলাচল, বাঁশের সাঁকো দিয়েই ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার
সফিকুল ইসলাম রানা | মতলব উত্তর (চাঁদপুর)
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কালিরবাজার এলাকায় ধনাগোদা নদী এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ভয়াবহ কচুরিপানা জমাট, অবৈধ জাগ স্থাপন ও দখলদারিত্বের কারণে গত চার মাস ধরে এ নদীতে নৌ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো, সেই সাঁকো দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।

ছবি: শফিকুল ইসলাম রানা ,
মতলব উত্তর চাঁদপুর।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) কালিরবাজার নৌকা ঘাটসংলগ্ন ধনাগোদা নদীতে সরেজমিনে দেখা যায়, কচুরিপানায় পুরো নদী ঢেকে গেছে। নৌকা চালানোর মতো খোলা পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। একসময় যেখানে নিয়মিত লঞ্চ ও নৌযান চলাচল করত, সেখানে এখন মানুষ কচুরিপানার ওপর দিয়ে কিংবা বাঁশের সাঁকো ধরে চলাচল করছে।
এই নদীপথ ব্যবহার করেই মতলব উত্তরের ধনাগোদা তালতলী উচ্চ বিদ্যালয় এবং মুন্সীগঞ্জের দাউদকান্দি উপজেলার মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত যাতায়াত করত। পাশাপাশি দাউদকান্দি, মতলব উত্তর ও গজারিয়া—এই তিন উপজেলার মানুষজনের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এ নদীপথ। তবে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে নদীর দুই পাশ থেকে অর্ধেক অর্ধেক করে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে পারাপার হচ্ছে।
পাঁচ কিলোমিটার নদীপথ অচল, বন্ধ ৮টি লঞ্চঘাট
শ্রী রায়েরচর ব্রিজ থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত ধনাগোদা নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় কচুরিপানার ভয়াবহ আগ্রাসন দেখা দিয়েছে। এই অংশে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল। একই সঙ্গে অচল হয়ে পড়েছে নদীপথের অন্তত ৮টি লঞ্চঘাট।
ফলে মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ এবং পাশ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া ও দাউদকান্দি উপজেলার সঙ্গে নৌ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
অবৈধ জাগ ও দখলদারিত্বে মৃতপ্রায় নদী
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধনাগোদা নদীর দুই পাড়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে জাগ (মাছ ধরার ফাঁদ) বসানো হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কচুরিপানা সরে যেতে না পেরে নদীতে জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে ‘সবুজ মরুভূমি’। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নিয়মিত খননের অভাব। ফলে নদীটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।
একসময় এই নদী ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। এই পথ ব্যবহার করেই ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য আনা-নেওয়া হতো। কিন্তু দখল, দূষণ, অবৈধ জাগ ও কচুরিপানার আগ্রাসনে সেই নদী আজ স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
ঝুঁকি নিয়ে পারাপার শিক্ষার্থীরা
মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, নৌকা না থাকায় প্রতিদিন স্কুলে যেতে আমাদের বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হয়। বৃষ্টি বা কুয়াশার সময় খুব ভয় লাগে, তবুও উপায় নেই।
কালিরবাজার এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ধনাগোদা নদী ছিল আমাদের জীবনরেখা। এখন সেটি কচুরিপানার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন আগে ব্যবস্থা নিলে আজ শিক্ষার্থীদের এমন ঝুঁকি নিতে হতো না।
স্থানীয়রা দ্রুত ধনাগোদা নদী খনন, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ, কচুরিপানা পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়—নদী বাঁচলে বাঁচবে জনপদ, নইলে ধনাগোদা হয়ে যাবে আরেকটি মৃত নদীর নাম।
মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, ধনাগোদা নদী আজ অবহেলা আর দখলদারিত্বের শিকার। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই পাওয়া গেছে, কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। অবিলম্বে কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ ও খনন কাজ শুরু না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।