তাজা খবর
বিজ্ঞাপন

চলনবিলের ধান ক্ষেতে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

সংগ্রহে: Oplus_16908288

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ ব্যবহার করে পরিযায়ী ও দেশীয় নানা প্রজাতির পাখি শিকারের অভিযোগ উঠেছে। শীতের শুরুতেই খাবারের সন্ধানে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চলনবিলে আসতে শুরু করলেও এক শ্রেণির শিকারির তৎপরতায় হুমকির মুখে পড়েছে এসব পাখি ও বিলের জীববৈচিত্র্য।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়ি পাড়া এলাকার খাল, বিল, নালা ও জল-াশয়গুলোতে পানি কমে ধানক্ষেত জেগে উঠেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জল-াশয়ে ছোট-বড় মাছও পাওয়া যাচ্ছে। বোনা আমন ধান ও মাছের খাবারের সন্ধানে বক, শা-লিক, চড়ুই, ডাহুকসহ দেশীয় নানা প্রজাতির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিও এসব এলাকায় আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সুযোগে শিকারিরা ধানক্ষেত ও জল-াশয়ের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে পাখি ধরছে। কোথাও বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি হত-্যার অভিযোগও রয়েছে। আবার বড় বাঁশের সঙ্গে উঁচু করে জাল টানিয়ে পাখি শিকার করা হচ্ছে। পাখি তাড়িয়ে জালের দিকে নিয়ে গিয়ে আটকে ফেলার পর সেগুলো ধরে ব্যাগে রাখা হয়। পরে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পাটগাড়ি পাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, নয়ন হোসেন ও সাগর আহমেদসহ স্থানীয়রা জানান, ফসলের জমিতে পানি দেওয়ার সময় মাটির নিচ থেকে পোকামাকড় বের হলে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খাবারের সন্ধানে আসে। এ সময় শিকারিরা বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে পাখি শিকার করছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
স্থানীয়দের দাবি, রাতচোড়া, টোগা, ব-ালিহাঁস, পানকৌড়ি, বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করে বিক্রি করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় এক জোড়া ভাড়ই ১০০ থেকে ১১০ টাকা, ব-ালিহাঁস ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, টোগা ৯০ থেকে ১১০ টাকা, রাতচোড়া ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বক ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে পাখি শিকার বন্ধে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। সংগঠনগুলোর দাবি, স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত ও জোরালো নজরদারি না থাকায় শিকারিদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সাল থেকে তারা পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছেন। শিকারিদের কাছ থেকে পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করার পাশাপাশি তাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কয়েক বছরে প্রায় দুই হাজার শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসন আরও সক্রিয় হলে পাখি শিকার অনেকটাই বন্ধ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
দি বার্ডস সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা পাখি রক্ষায় কাজ করলেও তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে চলনবিলে স্থায়ীভাবে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, পাখি নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ। খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য পরিযায়ী ও দেশীয় পাখি চলনবিলে আসে। এসব পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, পাখি শিকার জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। কেউ পাখি শিকার করে হাট-বাজারে বিক্রি করলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. নিয়ামুর রহমান জানান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত-্যা অপরাধ। পাখি শিকারের তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান পরিচালনা করে তা বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে নিরাপদে চলনবিলে আসতে পারবে পরিযায়ী পাখিরা এবং রক্ষা পাবে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মতামত জানান

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
হোম
লাইভ