সনাতন পদ্ধতি ব্যবহারে রক্ষা পাচ্ছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রাবার ড্যাম’।
এরশাদুল হক জেলা প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ।
আধুনিক যন্ত্র বা ড্রেজারের আগ্রাসন ঠেকিয়ে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীতে এখনও টিকে রয়েছে ব-ালু উত্তোলনের সম্পূর্ণ সনাতন পদ্ধতি। নদীর তলদেশে ডুব দিয়ে স্রেফ হাতের বল ও ব-ালতি ব্যবহার করে ব-ালু তোলার এই কঠিন উপায়ের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে এলাকার প্রায় ১,৭০০ শ্রমজীবী পরিবার। একই সাথে এই পদ্ধতির মাধ্যমে রক্ষা পাচ্ছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘রাবার ড্যাম’ এবং হাজার একর ফসলি জমি।
সরেজমিনে নদীর রাবার ড্যাম ও মাটগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাঁটু থেকে বুক পানিতে নেমে তীব্র রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করছেন শ্রমিকেরা। আধুনিক কোনো যন্ত্র নয়, পাঁচজন করে একেকটি দলে ভাগ হয়ে ডুব দিয়ে ব-ালু তুলে তারা নৌকা ভর্তি করছেন। পরে সেই ব-ালু রাবার ড্যামের পাশে ফেলার পর ৬ ইঞ্চির পাইপ ও সেইভ মেশিনের মাধ্যমে সুরমা নদীর মূল স্টীল বডি নৌকায় লোড করা হচ্ছে।
নদীতে কর্মরত বাঘরা গ্রামের শ্রমিক জসিম উদ্দিন ও রাজনগর গ্রামের জাকির জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া ও টানা পানিতে কাজ করার ফলে সর্দি-জ্বর নিত্যদিনের সঙ্গী। শরীর ভেঙে পড়লেও পেটের তাগিদে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। দিনশেষে জনপ্রতি ৯০০ থেকে ১,২০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে পরিবার ও সন্তানদের অন্নসংস্থান চলে। স্থানীয় শ্রমিক মোস্তফা কামাল জানান, কষ্ট অনেক, কিন্তু সনাতন পদ্ধতি চালু থাকায় আমরা বহু মানুষ কাজ করে ভালো আছি। এখানে ড্রেজার চললে এত মানুষ একবারে বেকার হয়ে যেত।
তবে এ পদ্ধতির কিছু ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশগত দিকও উঠে এসেছে। নদীর কিছু অংশে পাড় ভাঙন এবং সেইভ মেশিনের উচ্চ শব্দে স্থানীয় বাসিন্দাদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ব-ালু মহালের ইজারাদার হারুন মিয়া বলেন, রাবার ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চললে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে হাজার হাজার কৃষকের ওপর। গত মৌসুমে নদীর গভীরতা বাড়ায় চৈত্র মাসেও জমিতে সেচের পানি পাওয়া গেছে। পরিবহন ব্যয় বাড়লেও আমরা রাবার ড্যাম ও কৃষকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। শব্দদূষণ কমাতে দ্রুত সাইলেন্সার বসানোর আশ্বাসও দেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ জানান, খাসিয়ামারা নদীর রাবার ড্যামটি এ অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি স্থাপনা। এটিকে সুরক্ষিত রেখে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা বজায় রেখে নিয়মমাফিক ব-ালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা তদারকি করছি। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে সরকারি বিধিমালা মেনে যেন কাজ পরিচালিত হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সেইভ মেশিনের শব্দদূষণ দূর করতে ইজারাদারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যন্ত্রের যান্ত্রিকতায় যখন হাজারও মানুষ কাজ হারাচ্ছে, তখন খাসিয়ামারা নদীতে সনাতন পদ্ধতির এই প্রয়োগ একদিকে যেমন শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান করছে, অন্যদিকে সরকারি সম্পদ ও স্থানীয় কৃষি সংরক্ষণে রাখছে কার্যকর ভূমিকা।