চীনের সমন্বিত সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বিস্তার: জে-২০, এইচকিউ-১৭এ, এফডি-২০০০, এলডি-২ রাডার ও টাইপ-০৭৬ নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করছে।
বিশ্বের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের নজর এখন চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত সামরিক শক্তির দিকে। বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, রাডার প্রযুক্তি এবং নৌবাহিনীর সমন্বিত আধুনিকীকরণের মাধ্যমে বেইজিং এমন একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধক্ষমতা গড়ে তুলছে, যা ভবিষ্যতের উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স (PLAAF)-এর জে-২০ পঞ্চম-প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। বছরে প্রায় ১২০টি জে-২০ উৎপাদনের সক্ষমতা চীনকে বিশ্বের বৃহত্তম স্টিলথ যুদ্ধবিমান অপারেটরে পরিণত করেছে।
বর্তমানে এই বিমানগুলো ১৪টি ফ্রন্টলাইন স্কোয়াড্রনে দায়িত্ব পালন করছে এবং আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, দূরপাল্লার আক্রমণ, নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ পরিচালনা ও প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ভেদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জে-২০ বহরকে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখতে চীন বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর সামনের সারিতে রয়েছে এইচকিউ-১৭এ (HQ-17A) স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
যুদ্ধবিমান, ড্রোন, হেলিকপ্টার, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি এই সিস্টেমটি সর্ব-আবহাওয়ায় পরিচালনাযোগ্য।
উন্নত রাডার, স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য নির্ধারণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং চলমান অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা এটিকে সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি এবং কৌশলগত স্থাপনা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করেছে।
এই প্রতিরক্ষা বলয়ের পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে এলডি-২/জেএসজি-১০০ (LD-2/JSG-100) ত্রিমাত্রিক অ্যাকুইজিশন রাডার। প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম এই ডিজিটাল ফেজড-অ্যারে রাডার একই সময়ে বহু লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত, ট্র্যাক এবং শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে।
সংগ্রহ করা তথ্য সরাসরি ফায়ার কন্ট্রোল ইউনিটে পাঠানো হয়, যার ফলে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা সম্ভব হয়। এ কারণেই এটিকে চীনের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্সর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মধ্য ও দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে রয়েছে এফডি-২০০০ (FD-2000) সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যবস্থা। এটি যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং নির্দিষ্ট ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য নকশা করা হয়েছে। একটি ফায়ার ইউনিট থেকে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে হামলা চালানোর সক্ষমতা
উন্নত রাডার গাইডেন্স এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধী প্রযুক্তি এই ব্যবস্থাকে কৌশলগত প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল, সামরিক ঘাঁটি ও জাতীয় অবকাঠামো সুরক্ষায় এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সমুদ্রভিত্তিক শক্তি বৃদ্ধিতেও চীন নতুন সক্ষমতা যুক্ত করেছে টাইপ-০৭৬ “সিচুয়ান” যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে। প্রায় ৪০,০০০ টন স্থানচ্যুতির এই জাহাজে রয়েছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপাল্ট (EMALS), যা ফিক্সড-উইং ড্রোন, বিভিন্ন ধরনের মানববিহীন আকাশযান এবং হেলিকপ্টার পরিচালনায় সক্ষম।
ড্রোন ক্যারিয়ার, অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ এবং লাইট এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের সমন্বিত বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ, স্থল অভিযানে সহায়তা, সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধ এবং দীর্ঘপাল্লার ড্রোন অপারেশনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সামুদ্রিক যুদ্ধের কৌশলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, একটি দ্বীপভিত্তিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১১টি এইচআইএমআরএস (HIMARS) রকেট লঞ্চার এবং ৫০০-এর বেশি এটিএসিএমএস (ATACMS) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান, এইচকিউ-১৭এ, এফডি-২০০০, এলডি-২/জেএসজি-১০০ রাডার এবং টাইপ-০৭৬-এর মতো প্ল্যাটফর্ম নিয়ে গড়ে ওঠা চীনের সমন্বিত প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট লঞ্চারের সংখ্যা নয়, বরং সেন্সর, কমান্ড নেটওয়ার্ক, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং উৎপাদন সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
বর্তমান কৌশলগত বাস্তবতায় আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করছে উৎপাদনক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, স্টিলথ প্ল্যাটফর্ম, সমন্বিত রাডার নেটওয়ার্ক, বহুস্তরীয় বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন অপারেশন এবং যৌথ কমান্ড ব্যবস্থার ওপর। এ কারণেই সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতায় কেবল নতুন অস্ত্র সংগ্রহ নয়, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, শিল্পভিত্তিক উৎপাদন এবং সমন্বিত যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে।