তাজা খবর
বিজ্ঞাপন

একটি মৃ/ত্যু, সাংবাদিকদের ভবিষ্যতের দিকে ছুড়ে দেওয়া কঠিন প্রশ্ন

Desk Editor 30 minutes আগে | ০৬:৩৬ AM

একটি মৃ/ত্যু, সাংবাদিকদের ভবিষ্যতের দিকে ছুড়ে দেওয়া কঠিন প্রশ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট :

বরিশাল থেকে ফিরে আসা এক স্মৃতি আজ বড় বেশি তাড়া করছে

পুলক চ্যাটার্জি। বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে পরিচিত একটি নাম। দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান। শুধু একটি পদবি দিয়ে যাঁকে চেনানো যায় না। দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের জন্য ছুটে চলা, খবরের পেছনে থাকা, সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে বরিশালের সাংবাদিক সমাজেরই একটি পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যায় সেই পুলকদার মর-দেহ উদ্ধার হলো বরিশালের সমকাল কার্যালয় থেকে। ঘটনাস্থল থেকে একাধিক চিঠি বা চিরকুট উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং মৃত-্যুর চূড়ান্ত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

কিন্তু পুলকদার চলে যাওয়ার খবরের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত একটি স্মৃতি বারবার ফিরে আসছে।

২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল যখন তাঁকে অব্যাহতি দেয়, সেদিন আমি বরিশালে ছিলাম। অব্যাহতির চিঠি যখন আসে, আমি তাঁর সামনেই বসা ছিলাম। বিষয়টি আমার জন্যও ছিল বিব্রতকর এবং কষ্টের।

বিজ্ঞাপন

কেন তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল—তার কিছু কারণ তখন অনুমান করা যেত। বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, কাজের গতি এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর ওপর আগে কয়েকবার চাপ বা নোটিশ এসেছিল বলে আমি জানতাম।

কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ার পরদিন পুলকদা আমাকে একান্তে ডেকে যে কথাটি বলেছিলেন, সেটি আজও কানে বাজে।

তিনি বলেছিলেন, এই বয়সে আর কোথাও তাঁর সময় কাটানোর জায়গা নেই। শরীরের নানা ব্যথা-বেদনা নিয়ে সারাদিন বাড়িতে পড়ে থাকলে সময় কাটবে না। চাকরি না থাকলেও তিনি আগের মতো সমকাল অফিসে আসতে চান।

বিজ্ঞাপন

শুধু একটি অনুরোধ করেছিলেন—বিষয়টি যেন ঢাকায় না জানাই।

আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম—

সমকালে চাকরি থাকুক বা না থাকুক, বরিশাল অফিস তো আপনারই।

বিজ্ঞাপন

তারপর সত্যিই পুলকদা আগের নিয়মেই অফিসে আসতে শুরু করেন।

দুপুরে আসতেন। আমাদের সঙ্গে বসতেন। আড্ডা দিতেন। অনেক সময় রাত পর্যন্ত থাকতেন। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারত না যে তিনি আর সমকালের কর্মী নন।

অফিসে তাঁর একটি বড় চেয়ার ছিল। আমরা কেউ সেখানে বসতাম না।

বিজ্ঞাপন

অফিস সহকারী দীপকদাও ছিলেন তাঁর ভীষণ ভক্ত। পুলকদা অফিসে ঢুকলেই আগের মতো তাঁর জন্য চা তৈরি করে দিতেন।

অর্থাৎ চাকরিটি চলে গেলেও অফিসটির সঙ্গে পুলকদার সম্পর্কটি যেন শেষ হয়নি।

বরং সেটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচিত আশ্রয়।

বিজ্ঞাপন

তারপরও জীবন তাঁকে অন্য কোথাও বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি

নির্বাচনের পর আমি ঢাকায় চলে আসি। মাঝেমধ্যে ফোনে পুলকদার সঙ্গে কথা হতো।

একসময় শুনলাম, তিনি অন্য কোথাও কাজ শুরু করেছেন। কিছুদিন পর আবার শুনলাম, সেখানেও আর নেই।

বিজ্ঞাপন

সুমন চৌধুরী ভাইয়ের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে খবর পেতাম—পুলকদা আগের মতোই সমকাল অফিসে আসেন, দীর্ঘ সময় বসে পত্রিকা পড়েন, সময় কাটান।

অফিসের একটি চাবিও তাঁর কাছে ছিল।

প্রকাশিত সংবাদেও সমকালের বর্তমান ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী জানিয়েছেন, পুলক চ্যাটার্জির কাছে অফিসের একটি চাবি থাকত এবং তিনি মাঝে মাঝে সেখানে এসে সময় কাটাতেন।

বিজ্ঞাপন

১১ সেপ্টেম্বর: সেই চাবি নিয়েই শেষবারের মতো অফিসে

শুক্রবারও পুলকদা যথারীতি অফিসে যান।

কিছু চিঠি লেখেন। পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশেও।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকেও হাতের লেখা শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

একটি চিঠিতে মেয়ের পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

আরেকটি চিঠি ছিল সমকালের বর্তমান ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে। সেখানে তাঁর পাওনা অর্থ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এখানেই উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চাকরি শেষ হলেও তাঁর পাওনা কি শেষ হয়ে গিয়েছিল?

না।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, তাঁর পাওনা বেতন বা নিয়মিত ভাতা নয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের চাকরিজীবনের গ্র্যাচুইটি এবং অর্জিত ছুটি নগদায়নের অর্থ পাওয়ার বিষয়টি ছিল।

এই অর্থ তিনি পাননি—এমন দাবি তাঁর চিঠিতে উঠে এসেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সমকালের কাছে তাঁর সুনির্দিষ্ট পাওনার পরিমাণ কত, তা বর্তমান ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী জানেন না বলে জানিয়েছেন।

এই জায়গাটি তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

বিজ্ঞাপন

কারণ এটি শুধু একজন সাংবাদিকের পাওনা-প্রাপ্তির প্রশ্ন নয়।

এটি প্রশ্ন—একজন দীর্ঘদিনের কর্মীর কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর তাঁর আর্থিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

পুলকদার মৃত-্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়

বিজ্ঞাপন

পুলক চ্যাটার্জির মৃত-্যু নিয়ে এখনই কোনো একক কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

পুলিশও প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্ম-হত-্যা হিসেবে ধারণা করছে এবং ময়নাতদন্তের পর মৃত-্যুর বিষয়ে আরও পরিষ্কার হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে।

তবে তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মজীবন, চাকরি হারানোর পরের সময়, একাকীত্ব, শারীরিক অসুস্থতা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আর সেখানেই পুলকদার মৃত-্যু সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়।

আমরা কি আমাদের সাংবাদিকদের শুধু তাদের কর্মক্ষম সময়টুকুর জন্য প্রয়োজন মনে করি?

একজন তরুণ রিপোর্টার ২০-৩০ বছর ধরে রাত-দিন ছুটবেন।

বিজ্ঞাপন

বন্যা, নির্বাচন, সংঘাত, দুর্নীতি, জনদুর্ভোগ—সবকিছুর খবর করবেন।

নিজের পরিবারকে সময় দেবেন কম। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ কমবে। একসময় বয়স বাড়বে। শরীর আগের মতো সাড়া দেবে না। প্রযুক্তি বদলাবে। নতুন প্রজন্ম আসবে।

তখন কী হবে?

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সংকট—অবসর নয়, অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশায় অনেকেই দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করেন। কিন্তু মাঠের সাংবাদিক থেকে সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপনার উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কর্মজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন আছে প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবসম্পদ নীতি নিয়েও।

একজন প্রবীণ সাংবাদিককে যদি কর্মক্ষমতার কারণে বাদ দিতেই হয়, তাহলে তাঁর পরবর্তী জীবন কীভাবে নিরাপদ হবে—সেই পরিকল্পনা কি প্রতিষ্ঠানগুলোর থাকা উচিত নয়?

দীর্ঘদিনের কর্মীর গ্র্যাচুইটি, ছুটি নগদায়ন, বীমা, অবসরকালীন নিরাপত্তা এবং অন্যান্য পাওনা সময়মতো নিশ্চিত করা যায় কি না—এসব প্রশ্নও সামনে আসে।

বিজ্ঞাপন

কারণ চাকরি শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়ার নাম নয়।

দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে একজন মানুষের সম্মানজনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকার নিশ্চয়তাও চাকরির অংশ।

তরুণ সাংবাদিকদের জন্যও বড় সতর্কবার্তা

বিজ্ঞাপন

পুলকদার জীবন তরুণ সাংবাদিকদের জন্যও একটি শিক্ষা রেখে গেল।

সংবাদের পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের জীবন, পরিবার, বন্ধু ও ভবিষ্যৎকে যেন কেউ পুরোপুরি ভুলে না যায়।

পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন—

বিজ্ঞাপন

নিজের দক্ষতা সময়ের সঙ্গে আপডেট করা, আর্থিক পরিকল্পনা করা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের কর্মজীবন নিয়ে আগেভাগেই ভাবা।

কারণ সাংবাদিকতার মাঠে আজ যিনি তরুণ, একদিন তিনিও প্রবীণ হবেন।

আজ যে রিপোর্টার রাতভর ছুটছেন, একদিন তাঁরও হয়তো চলাফেরার গতি কমবে।

বিজ্ঞাপন

তখন তাঁর পাশে কে থাকবে—এই প্রশ্ন-টি এখন থেকেই ভাবতে হবে।

পুলকদার জন্য শেষ কথা

সমকাল অফিসের সেই চেয়ারটি হয়তো এখন খালি।

বিজ্ঞাপন

যে অফিসে চাকরি না থাকলেও তিনি প্রতিদিন এসে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন—সেই অফিসেই শেষবার তাঁকে পাওয়া গেল।

কী অদ্ভুত পরিণতি!

একটি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি শেষ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান-টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি কখনো।

বিজ্ঞাপন

একটি চাবি তাঁর কাছে ছিল।

সেই চাবি দিয়ে তিনি অফিসে ঢুকতেন।

আর শেষ দিনেও সেই চাবি নিয়েই তিনি এসেছিলেন তাঁর পরিচিত সেই জায়গাটিতে।

বিজ্ঞাপন

পুলকদার মৃত-্যু তাই শুধু একজন সাংবাদিকের চলে যাওয়া নয়।

এটি আমাদের সংবাদপেশার ভেতরের এক গভীর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—

যে মানুষগুলো সারাজীবন অন্যের গল্প লিখলেন, তাঁদের নিজের শেষ গল্পটি কে লিখবে?

বিজ্ঞাপন

আরও বড় প্রশ্ন—

একজন সাংবাদিক যখন তাঁর যৌবন, সময়, শ্রম ও জীবনের সেরা বছরগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দিয়ে দেন, তখন তাঁর বয়সের শেষ প্রান্তে সেই প্রতিষ্ঠান এবং পুরো সাংবাদিক সমাজ তাঁর জন্য কী রেখে যায়?

পুলকদার মৃত-্যু সেই প্রশ্নই রেখে গেল।

বিজ্ঞাপন

উত্তরটা এখন আমাদের খুঁজতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আপনার মতামত জানান

আরও সংবাদ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
হোম
লাইভ