এত সম্পদের উৎস কী?’ সালাহউদ্দিনকে ঘিরে হাসনাতের একের পর এক প্রশ্ন।
নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের পুরোনো দুর্নীতি মামলা, সম্পদের হিসাব, গুলশানের সম্পত্তি এবং সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয়—সব মিলিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে এসব প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপি-মন্ত্রীদের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের আহ্বান জানান হাসনাত।
পুরোনো দুর্নীতি মামলার প্রসঙ্গ
হাসনাতের পোস্টে দাবি করা হয়, ২০০৭ সালে এক কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই মামলায় ২০০৮ সালে তাঁকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড এবং ঘুষের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্তের আদেশের কথাও পোস্টে তুলে ধরেন হাসনাত।
এ ছাড়া অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে করা আরেকটি মামলায় ২০০৮ সালে সালাহউদ্দিন আহমেদের ১৩ বছরের সাজা হয়েছিল বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন হাসনাত।
চকরিয়ায় মাছের ঘের-সংক্রান্ত দুটি মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরে হাসনাত দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে ওই মামলাগুলো থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদ খালাস পান।
‘৬.৩ কোটি থেকে ৩০ কোটি—এত সম্পদের উৎস কী?’
হাসনাতের পোস্টের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-টি সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদের সম্পদের হিসাব ঘিরে।
নির্বাচনী হলফনামার তথ্যের বরাত দিয়ে হাসনাত দাবি করেন, ২০০৮ সালে এ দম্পতির মোট সম্পদ ছিল প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এরপরই প্রশ্ন তোলেন তিনি—‘এত সম্পদের উৎস কী?’
হাসনাত তাঁর পোস্টে আরও দাবি করেন, প্রায় দুই দশক আগে গুলশানের ‘প্লাটিনাম রেসিডেন্স’ নামে একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হন। গুলশানে তাঁর একাধিক বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে বলেও আলোচনা আছে—এমন দাবি করেন হাসনাত।
সরকারি চাকরি থেকে রাজনীতি—সম্পদ বৃদ্ধির হিসাব কোথায়?
সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন উল্লেখ করে হাসনাত প্রশ্ন তোলেন তাঁর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির হিসাব নিয়ে।
হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে ব্যবসা করার সুযোগ তাঁর ছিল না। চাকরি ছাড়ার সময় বেতন-ভাতাসহ মাসিক আয় ছিল প্রায় ছয় হাজার টাকা—এমন দাবিও করেন তিনি।
এরপর প্রশ্ন তুলে হাসনাত বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিতে আসা ব্যক্তি কীভাবে পরবর্তী সময়ে গুলশানের মতো ব্যয়বহুল এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন—তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
শুধু দেশীয় সম্পদ নয়, সালাহউদ্দিন আহমেদের সন্তানদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাসনাত।
তাঁর প্রশ্ন—এই অর্থের উৎস কী ছিল? সম্পদের কতটা আয়, কতটা উত্তরাধিকার, কতটা বিনিয়োগ এবং অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে এসেছে—তার কি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হিসাব রয়েছে?
বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে ব্যয় করা অর্থ কীভাবে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থে হলে সবার ব্যাংক হিসাব তলব হোক’
বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত প্রশ্ন তোলেন—রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে একই নিয়ম কি এমপি-মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে?
তাঁর দাবি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে শুধু সমালোচক বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নয়, প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রী এবং তাঁদের নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবও নিয়মিত যাচাই করা উচিত।
এমনকি এই প্রক্রিয়া তাঁকে দিয়ে শুরু করার আহ্বানও জানান হাসনাত।
‘দেখি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সৎ সাহস দেখাতে পারে কি না’
পোস্টের শেষদিকে হাসনাত মূল প্রশ্ন-টি আরও স্পষ্ট করে তোলেন—সালাহউদ্দিন আহমেদের বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী এবং তার পক্ষে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হিসাব আছে কি না।
তিনি দাবি করেন, দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে একই ধরনের যাচাই সবার ক্ষেত্রে করা উচিত।
হাসনাতের বক্তব্যের সারকথা—যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে সেই যাচাই ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
তবে হাসনাত আবদুল্লাহর পোস্টে উত্থাপিত সম্পদ, সম্পদের উৎস, গুলশানের সম্পত্তি ও বিদেশে শিক্ষাব্যয়ের বিষয়ে তাঁর করা সব দাবির স্বাধীন সরকারি যাচাই এই প্রতিবেদনে করা হয়নি। সালাহউদ্দিন আহমেদের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।