দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস সিঙ্গাপুরের
ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর সম্পর্ক জোরদারে দক্ষ জনশক্তি, অভিবাসী কল্যাণ ও যুব উন্নয়নে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম আজ সকাল সাড়ে ১১টায় সিঙ্গাপুরের জনশক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুব বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীনেশ বাসু দাশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ন্যায়সংগত ব্যবস্থা, সুশাসন এবং দেশের জনগণের জন্য আরও উন্নত সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি জানান। দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিঙ্গাপুর অগ্রণী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রস্তাব দেন তিনি।

জবাবে দীনেশ বাসু দাশ বলেন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। তিনি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও যৌথভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা সাধারণত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল।
এ সময় শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ প্রবাসীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তাদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং তাদের একটি বড় অংশ কেয়ারগিভিং ও নার্সিং খাতে কাজ করার সম্ভাবনা রাখেন। বয়স্কদের সেবায় সিঙ্গাপুরে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে সিঙ্গাপুরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালসহ বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ব্যয় ও ফি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দীনেশ বাসু দাশ। জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সরকার অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ ব্যয় কমাতে এবং নিয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সাশ্রয়ী করতে মধ্যস্বত্বভোগী ও ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা সহ নিয়োগ কার্যক্রম যৌথভাবে পর্যবেক্ষণের উপায় বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর একসঙ্গে খুঁজে দেখতে পারে।
দীনেশ বাসু দাশ সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসন উন্নয়নে দেশটির বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসিক ডরমিটরিগুলোর মানোন্নয়ন এবং আবাসন ব্যবস্থায় আরও কঠোর মানদণ্ড বাস্তবায়নে সিঙ্গাপুর সরকার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা ও উপযুক্ত আবাসন সুবিধার প্রাপ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
এসব উদ্যোগের প্রশংসা করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরে তিন-টি কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর সম্প্রতি চাকরি হারানো প্রায় ২০০ বাংলাদেশি কর্মীর পুনঃনিয়োগ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
দীনেশ বাসু দাশ অভিবাসী শ্রমিকদের বেতন না পাওয়ার ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ে জানানোর আহ্বান জানান। এতে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি ও উৎসবে বাংলাদেশি কর্মীদের ইতিবাচক অংশগ্রহণেরও প্রশংসা করেন তিনি। তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ সিঙ্গাপুরের জাতিগত ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈঠকে শামা ওবায়েদ ইসলাম দীনেশ বাসু দাশকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, তরুণদের সম্পৃক্ততা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সহযোগিতার অনেক সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলেও তিনি প্রস্তাব দেন।
প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে দীনেশ বাসু দাশ বলেন, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুব বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও তিনি এ খাতে আরও সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে দেখতে আগ্রহী।
এ সময় বাংলাদেশকে আসিয়ানের (ASEAN) ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সিঙ্গাপুরের সমর্থন কামনা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফট ডিপ্লোমেসি, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতিকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ সরকার বাজেট বরাদ্দ করেছে বলেও তিনি জানান।
তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী ধারণার বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা অথবা সিঙ্গাপুরে একটি যুবকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আরও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসার ক্ষেত্রে হয়র-ানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে দীনেশ বাসু দাশ বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সম্প্রতি ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করা সিঙ্গাপুরভিত্তিক রেস্টুরেন্ট চেইন ‘ফিশ অ্যান্ড কো.’-এর কথাও উল্লেখ করেন।
বৈঠকে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
বৈঠকটি উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষ দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, অভিবাসী কর্মীদের কল্যাণ, যুব উন্নয়ন, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করে।