তাজা খবর
বিজ্ঞাপন

আসিফের বাবার ‘লাইসেন্স’ ছিল কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট,এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে জাপানি বিনিয়োগের স্থানীয় অংশীদার—প্রশ্ন উঠছে কোথায় স্বার্থের সংঘাত?

খবর টিভি ডেস্ক ২৯ দিন আগে | ১০:৫১ AM

আসিফের বাবার ‘লাইসেন্স’ ছিল কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট, আর এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে জাপানি বিনিয়োগের স্থানীয় অংশীদার—প্রশ্ন উঠছে কোথায় স্বার্থের সংঘাত?
নিজস্ব প্রতিবেদক |

 

ডেস্ক রিপোর্ট :

এক বছর আগেও মাত্র একটি ঠিকাদারি লাইসেন্সকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বাবা ঠিকাদারি লাইসেন্স নেওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। যদিও ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে কোনো সরকারি কাজের জন্য আবেদন করা হয়নি, তবুও দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টার বাবার ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হওয়াকে স্বয়ং আসিফ মাহমুদই ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে স্বীকার করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

 

ঘটনাটি সামনে আসার পর আসিফ মাহমুদ প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং তার বাবার লাইসেন্স বাতিল করা হয়। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে নিশ্চিত করা হয়েছিল, লাইসেন্সটি কোনো কাজের জন্য ব্যবহার করে আবেদন করা হয়নি।

 

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে একই ধরনের স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠছে আরও বড় পরিসরে—এবার আলোচনার কেন্দ্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ এবং তার প্রতিষ্ঠান Stallion Capital।

 

ঘটনাটি আসলে কী?
সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দুটি বিশাল সেতু নির্মাণ। একটি বরিশাল–ভোলা সেতু, অন্যটি শরীয়তপুর–চাঁদপুর সেতু।

বিজ্ঞাপন

 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল–ভোলা সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১০ দশমিক ৮৬৭ কিলোমিটার এবং সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে শরীয়তপুর–চাঁদপুর সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। দুই প্রকল্পের মোট আনুমানিক ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা—অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ৪০ হাজার কোটি টাকার চেয়ে সরকারি/প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী অঙ্কটি বর্তমানে প্রায় ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।

 

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দুটি সেতুকেই PPP ভিত্তিতে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

 

এখানেই আসে জাপানি প্রতিষ্ঠান Miyagawa Kensetsu-এর প্রসঙ্গ।

বিজ্ঞাপন

 

২০২৫ সাল থেকেই জাপানি প্রতিষ্ঠান-টি বরিশাল–ভোলা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

 

বিজ্ঞাপন

আর Stallion Capital-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান-টি জাপানের Miyagawa Kensetsu-এর ‘key local partner and investment consultant’ এবং দুইটি সেতুর জন্য ৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের FDI secured করেছে।

 

অর্থাৎ, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাঈদ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠান নিজেই জাপানি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে স্থানীয় অংশীদারিত্বের দাবি করছে।

বিজ্ঞাপন

 

Stallion Capital-এর সঙ্গে সাঈদ ইব্রাহিমের সম্পর্ক কী?
প্রতিষ্ঠান-টির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা তথ্য অনুযায়ী, সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ Stallion Capital-এর চেয়ারম্যান। তার পেশাগত পরিচয়ও কেবল রাজনীতিকের ছেলে হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়।

 

বিজ্ঞাপন

AIUB-এর প্রকাশিত একাডেমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে University of Toronto থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তীতে University of Kent ও Imperial College London থেকে ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তিনি AIUB-তে শিক্ষকতা করেছেন এবং ফাইন্যান্স ও ক্যাপিটাল মার্কেট নিয়ে কাজ করেছেন।

 

অর্থাৎ, ‘সাঈদ ইব্রাহিমের কোনো পেশাগত অভিজ্ঞতা নেই’—এমন দাবি যাচাইযোগ্য তথ্যের সঙ্গে মেলে না।

বিজ্ঞাপন

 

 

প্রশ্নটা তাহলে কোথায়?
প্রশ্ন হলো—দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো বিনিয়োগে একজন ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর সন্তানের প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীর স্থানীয় অংশীদার ও বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হলো?

বিজ্ঞাপন

 

আর সেই মন্ত্রী যদি হন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, তাহলে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

 

বিজ্ঞাপন

সালাহউদ্দিন আহমেদের নির্বাচনী হলফনামা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার ছেলে সাঈদ ইব্রাহিমকে ৬০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে সাঈদ ইব্রাহিমের ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ঋণের তথ্য এবং সেই ঋণের সঙ্গে Southern Sea Coast Asset Management Ltd.-এর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, সাঈদ ইব্রাহিম বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এবং এর Tender & Purchase Committee-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

 

ফলে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে স্থানীয় অংশীদারিত্ব এবং একই সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বাবার অবস্থান—এই তিন-টি বিষয়কে আলাদা করে দেখা কঠিন।

 

বিজ্ঞাপন

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি
এখন পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, Stallion Capital-কে ওই দুই সেতুর সরকারি নির্মাণকাজ দেওয়া হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

সরকারি নথিতে দুই সেতু এখনও PPP প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রয়েছে। সেতু বিভাগও বরিশাল–ভোলা সেতুকে প্রস্তাবিত/প্রক্রিয়াধীন প্রকল্প হিসেবে দেখাচ্ছে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে PPP ভিত্তিতে নীতিগত অনুমোদনের পর পরবর্তী কার্যক্রম চলমান থাকার কথা জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

 

তাই এটিকে ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠান ৩৩ হাজার কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়ে গেছে এভাবে বলা তথ্যগতভাবে অতিরঞ্জিত হবে।

 

বিজ্ঞাপন

বরং যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী বলা যায়:

জাপানের Miyagawa Kensetsu-এর সঙ্গে বাংলাদেশের দুই বড় সেতু প্রকল্পে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে Stallion Capital-এর সম্পৃক্ততার দাবি প্রতিষ্ঠান-টির নিজস্ব ওয়েবসাইটে রয়েছে; একই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ।

 

বিজ্ঞাপন

আসিফ মাহমুদের ঘটনার সঙ্গে তুলনা কতটা যৌক্তিক?
এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

২০২৫ সালে আসিফ মাহমুদের বাবা একটি ঠিকাদারি লাইসেন্স নেওয়ার পর—যদিও কোনো সরকারি কাজের জন্য আবেদন করেননি—আসিফ নিজেই বলেছিলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বাবার ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হওয়া স্পষ্ট কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। পরে লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

 

বিজ্ঞাপন

আজকের ঘটনায় পরিস্থিতি একেবারে একই নয়।

কারণ আসিফের ক্ষেত্রে ছিল মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থার ঠিকাদারি লাইসেন্স; আর সাঈদ ইব্রাহিমের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য তথ্য বলছে, তার প্রতিষ্ঠান একটি জাপানি কোম্পানির স্থানীয় অংশীদার ও বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে।

 

বিজ্ঞাপন

তবে দুই ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে

ক্ষমতাসীন ব্যক্তির নিকটাত্মীয় যখন একই সরকারের বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত হন, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব, তথ্যের সুবিধা কিংবা পক্ষপাতের সম্ভাবনা কতটা থাকে?

 

বিজ্ঞাপন

এটাই মূল conflict-of-interest প্রশ্ন।

আর এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পক্ষের নয় শুধু; প্রয়োজন স্বচ্ছ সরকারি নথি, প্রকল্পের PPP প্রক্রিয়া, অংশীদার নির্বাচন, বিনিয়োগ চুক্তি এবং স্বার্থের ঘোষণার তথ্য প্রকাশ করা।

 

বিজ্ঞাপন

এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
১. Stallion Capital-এর সঙ্গে Miyagawa Kensetsu-এর আনুষ্ঠানিক চুক্তি কবে হয়েছে?

২. Stallion Capital ঠিক কোন ভূমিকার জন্য স্থানীয় অংশীদার—ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার, কনসালট্যান্ট, নাকি প্রকল্পের PPP অংশীদার?

৩. ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের FDI ‘secured’ বলতে চূড়ান্ত অর্থায়ন চুক্তি বোঝানো হয়েছে, নাকি বিনিয়োগের আগ্রহ/প্রস্তাব?

বিজ্ঞাপন

৪. দুই সেতুর প্রকল্পে Stallion Capital-এর আর্থিক অংশীদারিত্ব কত?

৫. সরকারি প্রকল্পে স্থানীয় অংশীদার নির্বাচন কীভাবে হবে এবং এতে কি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া থাকবে?

৬. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে অবগত কি না এবং তিনি কোনো পর্যায়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন কি না?

বিজ্ঞাপন

৭. সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ কি সম্ভাব্য conflict of interest নিয়ে কোনো disclosure বা recusal ব্যবস্থা নিয়েছে?

শেষ কথা
২০২৫ সালে একটি লাইসেন্স নেওয়ার ঘটনাকে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হিসেবে দেখা হয়েছিল

যদিও সেই লাইসেন্স দিয়ে কোনো সরকারি কাজ নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালে এখন আলোচনায় এসেছে তার চেয়ে অনেক বড় একটি বিষয়—একজন ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর ছেলে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, যে প্রতিষ্ঠান নিজেই দাবি করছে, তারা জাপানের একটি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের দুইটি বৃহৎ সেতু প্রকল্পে স্থানীয় অংশীদার ও বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে।

 

তবে পার্থক্যটিও স্পষ্ট: এখন পর্যন্ত সরকারি নির্মাণকাজ সরাসরি সাঈদ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।

বিজ্ঞাপন

 

তাই বিষয়টিকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সম্ভাব্য conflict of interest-এর গুরুতর প্রশ্ন হিসেবে দেখা এবং সরকারি নথি প্রকাশের দাবি তোলাই হবে তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার সঠিক পথ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মতামত জানান

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
হোম
লাইভ