নিউজ প্রকাশের পর সাংবাদিককে ফেক আইডি থেকে হুমকির অভিযোগ
পুলিশ ও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের দাবিতে উদ্বেগ, তদন্তের দাবি
প্রতিবেদক: মোঃ নাজিমুল হাসান নাজির
সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং অনলাইন অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন ফেক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে হুমকি ও চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি কথিত সাইবার গ্রুপের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক মনিটাইজেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন ভয় দেখিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য ও বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, **‘Cyber Zone’, ‘Rs Cyber Crimes’, ‘ECSF TEXT & PLP Update’, ‘Elite Cyber Security Force’, ‘Dark Net’, ‘The Cyber Security Force’, ‘Expart Cyber’, ‘Global Cyber’**সহ বিভিন্ন নামে পরিচালিত কথিত সাইবার গ্রুপ এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন সময় সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে।
নিউজ প্রকাশ করলেই মনিটাইজেশন বন্ধের হুমকি?
অভিযোগ অনুযায়ী, নিউজ প্রকাশের পর ফেক আইডি ব্যবহার করে ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্টে বলা হচ্ছে—এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের মনিটাইজেশন থাকবে না।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে কি এখন ফেক আইডি, সাইবার হুমকি এবং মনিটাইজেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডার্ক ওয়েব ও টেলিগ্রাম ঘিরে গুরুতর অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব কথিত সাইবার গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি Telegram চ্যানেল ও গ্রুপে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ, আদান-প্রদান এবং অর্থের বিনিময়ে তথ্য সরবরাহের দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগে ব্যবহৃত বা সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা Telegram লিংকগুলোর মধ্যে রয়েছে—
– https://t.me/cybersohag121
– https://t.me/+TpJ4f7n2Whw3Yzll
– https://t.me/linkZero_Trace_Defense
– https://t.me/emonkhan64hdue
– https://t.me/darknet_cyber_force_bd
– https://t.me/+-fjSUJBgn5w3YjFl
– https://t.me/WacfFile
একই লিংক একাধিকবার পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব Telegram গ্রুপ ও চ্যানেল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ লেনদেন এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রির মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। এমনকি কিছু তথ্য ডার্ক ওয়েবসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের ডাটাবেজ ও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের দাবি
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো—কথিত এসব সাইবার গ্রুপের বিভিন্ন Telegram চ্যানেল ও গ্রুপে সরকারি ডাটাবেজ ও ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডাটাবেজের তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে—এমন দাবিও সামনে এসেছে।
যদি সত্যিই কোনো সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডাটাবেজ বা কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রকাশ কিংবা বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। এতে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই নয়, সরকারি তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে এসব তথ্য সত্যিই সংশ্লিষ্ট সরকারি ডাটাবেজ থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, তথ্যগুলো কতটা নির্ভুল, এগুলো আসল নাকি ভুয়া/সম্পাদিত এবং কারা এসব তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করেছে—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এ মুহূর্তে বিষয়গুলোকে অভিযোগ ও দাবির পর্যায়েই বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘সাইবার নিরাপত্তা’ নাকি মানুষের জন্য নতুন আতঙ্ক?
সাইবার প্রযুক্তি মানুষের তথ্য ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যদি কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, অ্যাকাউন্টে প্রবেশের চেষ্টা, তথ্য বিক্রির দাবি কিংবা সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে কোনো সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশের পর যদি ফেক আইডির মাধ্যমে হুমকি পান এবং সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে সংবাদমাধ্যমের মনিটাইজেশন বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি অনলাইনে মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
ফেক আইডির আড়ালে কারা?
অভিযোগকারীদের দাবি, সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া অ্যাকাউন্টগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত পরিচয় গোপন করে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এসব ফেক অ্যাকাউন্টের পেছনে প্রকৃত ব্যক্তি বা সংগঠন কারা, তারা কোন ডিভাইস বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন Telegram গ্রুপের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কি না—তা প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব অ্যাকাউন্ট বা গ্রুপের বিরুদ্ধে সরকারি ডাটাবেজ, ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রমও যাচাই করার দাবি উঠেছে।
তদন্তের দাবি
ঘটনার সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধ তদন্তকারী সংস্থার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তদন্তে বিশেষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে—
– ফেক ফেসবুক আইডিগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা;
– সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে কারা হুমকি বা চাপ দিচ্ছে;
– কথিত Telegram গ্রুপ ও চ্যানেলগুলোর পেছনে কারা রয়েছে;
– সেখানে প্রকাশিত সরকারি ও ব্যক্তিগত তথ্যের উৎস কী;
– ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডাটাবেজের তথ্য থাকার দাবিটি সত্য কি না;
– একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের দাবির সত্যতা কী;
– নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অর্থের বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগ সত্য কি না;
– কথিত অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত;
– এবং সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে মনিটাইজেশন বন্ধের ভয় দেখানোর পেছনে কারা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
সাইবার প্রযুক্তি যেখানে মানুষের নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার জন্য, সেখানে সাইবারের নাম ব্যবহার করে যদি মানুষই অনিরাপত্তার শিকার হন—তাহলে প্রশ্ন একটাই, নিরাপত্তার নামে এই অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রক কারা?