সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা পরিষদ চত্বরে সংরক্ষিত একটি পুরানো সরকারি জিপ গাড়ি নীরবে বহন করে চলেছে বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ব্যবহৃত এই জিপটি আজ কেবলই একটি পুরানো যানবাহন নয়, বরং প্রশাসনিক ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় জিপটির বিভিন্ন অংশে মরচে ধরেছে এবং কিছু অংশ ক্ষয়ে গেছে। তবুও, অতীতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে এটি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে।
বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনের ইতিহাসে একসময় মহকুমা প্রশাসক বা ‘সাব-ডিভিশনাল অফিসার’ (SDO)-এর পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জেলা প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৯ সালে বিভিন্ন মহকুমা গঠন করে এবং প্রতিটি মহকুমার দায়িত্বে একজন করে এসডিও নিয়োগ দেয়। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব আদায়, উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি এবং মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক দায়িত্বও পালন করতেন।
স্বাধীনতার পরেও মহকুমাভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা বজায় ছিল। তবে ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে মহকুমা ব্যবস্থার পরিবর্তে উপজেলা ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার’ (UNO)-এর পদ এবং নতুন রূপ পায় মাঠ প্রশাসনের কাঠামো।
বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে সরকারের প্রধান নির্বাহী প্রতিনিধি হিসেবে ইউএনও প্রশাসনিক সমন্বয়, উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। এসডিও থেকে ইউএনও-তে এই রূপান্তরকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক আধুনিকায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা এই ঐতিহাসিক জিপটি প্রশাসনিক ইতিহাসের এক মূল্যবান সম্পদ। তবে খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় এটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই এটি কোনো নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর ইতিহাস তুলে ধরে একটি তথ্যফলক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা। এতে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস এবং মাঠ প্রশাসনের বিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে বলে তারা মনে করেন।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “এই জিপটি আমাদের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সময়ের সাক্ষী হিসেবে এটি সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রশাসনিক ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষী কেবল একটি পুরানো গাড়ি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, উন্নয়ন ও পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল, আর এটি সংরক্ষণ করা সময়েরই দাবি।