চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
পুলিশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো নিরাপত্তা,ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণ। কিন্তু হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ,অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের চিত্র সামনে আসায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মা-দক বাণিজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা,ঘুষ বাণিজ্য,রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মীর উপর হা-মলার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি,অবিলম্বে এই ওসিসহ সমগ্র থানার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না আনলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নার্সদের চরম অবহেলা ও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে দুই রোগীর মর্মান্তিক মৃত-্যু হয়। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি পত্রিকার সাংবাদিক মাসুদ আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করেন।
লাইভ চলাকালীন প্রথমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভিডিওটি ডিলিট করার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাংবাদিক মাসুদ আলম সত্য প্রকাশে অবিচল থাকলে ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নিজে সশরীরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত হয়ে তাঁর উপর ওতর্কিত হা-মলা চালান এবং হাতে মোচড় দিয়ে জোরপূর্বক মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং নিউজ প্রকাশ বন্ধ করতে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের মাধ্যমে নানা ধরনের অনৈতিক প্রস্তাব ও মামলার ভয় দেখানো হয়। এমনকি এই অপচেষ্টার অংশ হিসেবে একটি বিশেষ মহলকে দিয়ে ওসির পক্ষে মনগড়া প্রোপাগান্ডা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, ওসি সাইফুল ইসলামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে চুনারুঘাট থানা এলাকায় মা-দক ও চোরা-চালানের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেকেন্ড অফিসার সজল দাসের মাধ্যমে চিমটিবিল সীমান্ত এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল, ইয়-াবা, গা-ঁজা, মদ এবং ভারতীয় গরু চোরা-চালানের বড় একটি অংশ থেকে নিয়মিত মাসোহারা ও বখরা নেওয়া হয়।
প্রতিদিন রাত ১০টার পর ওসির রুমের দরজা বন্ধ করে এই অবৈধ অর্থ ভাগবাটোয়ার উৎসব চলে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। লোকদেখানো দু’একটি ছোট অভিযান পরিচালনা করা হলেও পর্দার আড়ালে মা-দক কারবারিদের রক্ষায় বেপরোয়া ভূমিকা পালন করছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
চুনারুঘাট থানায় সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়া এখন চরম দুর্লভ হয়ে উঠেছে। থানায় জিডি বা অভিযোগ লিখতে গেলে কম্পিউটার অপারেটরদের লিখার খরচ বাবত ৪ থেকে ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বিদেশগামী সাধারণ মানুষের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দেওয়ার নামে আকবরের মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য চলছে।
এছাড়া বিভিন্ন মামলার আসামিদের বাঁচানো, নিরপরাধ মানুষকে ইয়-াবা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় এবং সাধারণ মানুষকে হয়র-ানি করার এক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ওসি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, থানার বিভিন্ন এসআই বা পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে তারা প্রত্যাহার হলেও মূল হোতা ওসি সাইফুল ইসলাম সব অপকর্মের নির্দেশদাতা হয়েও বহাল তবিয়তে থেকে ছলেবলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন।
এর আগে বাহুবল মডেল থানায় দায়িত্ব পালনকালেও ওসি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সে সময়ও জনরোষ ও বিক্ষোভের মুখে তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এছাড়াও ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার হাতিরঝিল থানায় দায়িত্বরত অবস্থায় দীপ্ত টিভির সম্প্রচার কর্মকর্তা তানজিল জাহান তামিম হত-্যাকাণ্ডের সময় অপরাধীদের থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়া ও দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ মেলায় তাকে দ্রুত ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে ক্লোজড করা হয়েছিল। এত বড় চাঞ্চল্যকর ও অপরাধমূলক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও চুনারুঘাটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় তাকে পোস্টিং দেওয়া নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল।
একের পর এক পুলিশ সদস্য ও এসআইয়ের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অপকর্মের অভিযোগে প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটলেও মূল দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে ওসি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রতিবাদী কণ্ঠরোধে তিনি হা-মলা ও মামলার ভয় দেখিয়ে চলেছেন।
চুনারুঘাটের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ অবিলম্বে ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত সাপেক্ষে অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি চুনারুঘাট থানাকে দা-লাল ও দুর্নীতিমুক্ত করে একটি জনবান্ধব পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে সমগ্র থানার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।